গালের ব্রণ ইনফেকশন চিকিৎসার নামে তরুণীর মুখে চুমু ও শরীরে হাত দেওয়া চিকিৎসককে চাকরিচ্যুত করেছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সোমবার (১৭ জুন) অভিযুক্ত চিকিৎসককে আর চেম্বার করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ওই হাসপাতালের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের প্রধান অচিন্ত কুমার নাগ।

অভিযুক্ত ডাক্তারের নাম মো. শওকত হায়দার। তিনি চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেজার কসমেটিক সার্জন।

এদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসককে হাসপাতাল থেকে চাকরিচ্যুতও করা হলেও চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ সংগঠন বিএমডিসি’তে (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনাই নেই!

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন চিকিৎসককে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের যেসব শর্ত পূরণ করে আসতে হয় তাতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর কোনো ‘অনৈতিক সম্পর্ক’ থাকতে পারবে না। এটা স্পষ্টত নীতিমালা বিরোধী। কিন্তু একইসঙ্গে কেউ সে নীতিমালা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কিছু লেখা নেই।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, “প্রথমত এটা অনৈতিক। অনৈতিকতার কারণে বিএমডিসি তাকে শাস্তি দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী চাইলে তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করতে পারে। দু’টো কেসই প্রযোজ্য।”

এদিকে বিএমডিসির নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, কোনো নারী রোগীকে ‘এক্সামিন’ করতে হলে নিশ্চয়ই সেখানে আরেকজন নারীকে উপস্থিত থাকতে হবে। এবং সেখানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলী সবই উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু যৌন হয়রানির অভিযোগে কোনো চিকিৎসক অভিযুক্ত হলে বিএমডিসির নীতিমালায় তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে সে সর্ম্পকে কিছু বলা নেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা যে অনৈতিক সেটা তো বলাই আছে। ‘ইট ইজ অ্যা মেন্ডেটরি টু প্রেজেন্ট অ্যা ফিমেল অ্যাটেনডেন্ট।’ কোনো চিকিৎসক এর ব্যত্যয় করলে বিএমডিসি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।”

‘এই বিষয়গুলো বৈশ্বিকভাবেই চিকিৎসকদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু সেটা বাংলাদেশে যদি প্রয়োগ না হয় বা ফলো করে কিংবা করা হয় কিনা সেটা ভিন্ন ব্যাপার’, যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এক চিকিৎসকের উদাহরণ দিয়ে ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘লন্ডনে বাংলাদেশের এক চিকিৎসক এ ধরনের অনৈতিক কাজ করেছিলেন। যে কারণে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানকার কারাগারে রয়েছেন। এগুলো বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকদের জন্য নৈতিকতার ভেতরে রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রাকটিস নাই।’

“যেহেতু এখানে মেন্ডেটরি বিষয়ের লঙ্ঘন হয়েছে তাই বিএমডিসি তার নাম ‘উইথড্র’ করতে পারে, তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে পারে, ‘ইট উইল কাভারআপ উইথ অনৈতিক”, বলেন ডা. রশিদ-ই-মাহবুব।

বিএমডিসির নীতিমালায় ‘কোড অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট এটিকুইট অ্যান্ড এথিক্স’ শিরোনামে চিকিৎসকদের জন্য ‘ইমপ্রপার পারসোনাল রিলেশনশিপ উইথ প্যাসেন্টস’ ক্লজে চিকিৎসকদের জন্য বলা হয়েছে, চিকিৎসাবিদ্যায় যেকোনো ক্ষেত্রে অনৈতিক কাজ পেশাগত কাজের মধ্যে পড়ে না। কোনো চিকিৎসক যদি রোগীর দুবর্লতা বা যে কোনো কারণে যৌন হয়রানি বা রোমান্টিক কিংবা আবেগতাড়িত করে সুবিধা আদায় করে তাহলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) তার বিরুদ্ধে সিরিয়াস অ্যাকশন নিতে পারবে।

সেখানে আরও লেখা রয়েছে, চিকিৎসার কারণে চিকিৎসককে রোগীর সঙ্গে খুব ব্যক্তিগত সর্ম্পক গড়তে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সর্ম্পক গড়তে গিয়ে তাকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে ওই সর্ম্পকের কারণে যাতে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বা সে যেন কোনো ধরনের অনৈতিক হয়রানির শিকার না হয়। ব্যক্তিগত সর্ম্পক গড়তে গিয়ে অবশ্যই চিকিৎসককে দায়িত্বশীল আচরণ এবং আস্থার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। চিকিৎসককে এ ক্ষেত্রে খুব যত্ন নিয়ে কাজ করতে হবে যাতে তার বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিক অভিযোগ না ওঠে।

তবে বিএমডিসির নীতিমালায় এসব অভিযোগে অভিযুক্ত হলে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।

এ বিষয়ে বিএমডিসির রেজিস্ট্রার ডা. মো জাহেদুল হক বসুনিয়া বলেন, “এটাই যোগ করতে হবে। এই ‘এটিকোট’টা আমরা তৈরি করেছি এক বছরও হয় নাই, আগে এটাও ছিল না। এখন এর ভিত্তিতে যখন রেগুলেশন তৈরি হবে তখন সেটি পাস হলে আইনের সংশোধনও করতে হবে। এগুলো আসলে ধাপে ধাপে করতে হবে।”

ডা. বসুনিয়া জানান, গত ২৫ মে কাউন্সিলের জেনারেল সভা হয়েছে যেখানে সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলরাও ছিলেন। সেখানে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে কোন কোন বিষয়গুলো যৌন হয়রানির মধ্যে পড়বে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটাও সুপারিশ করবে সে কমিটি।

এর আগে তো এসব বিষয় ছিল না মন্তব্য করে ডা. জাহিদুল হক বসুনিয়া বলেন, ‘গত ২৭ বছর ধরে কাজ করছি, কিন্তু এরকম কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। চিকিৎসকের অদক্ষতা, চিকিৎসাকার্যে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা এসব অভিযোগই এতদিন শুনেছি। যেহেতু এটা নতুন কনসেপ্ট তাই নতুন করে পদক্ষেপ নিতে হবে। এত বিশ্বাস করে যে রোগী আসবে তার সঙ্গে যে এমন অসংলগ্ন ব্যবহার করতে পারে এটা আমাদের মাথাতেই ছিল না।’ সময় বা অবস্থার তাগিদেই সব করতে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ জুন রাজধানীর ধানমণ্ডিতে অবস্থিত চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানের অভিযোগ আনেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তিনি এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন।

ওই তরুণীর অভিযোগ, ব্রণের ইনফেকশন দেখার ছলে পপুলারের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেজার কসমেটিক সার্জন ডা. মো. শওকত হায়দার তার গালে চুমু দেওয়াসহ যৌন হয়রানি করেছেন।

ঘটনার বিবরণে ওই তরুণী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ত্বকে ব্রণের সমস্যা নিয়ে পরিচিত একজনের রেফারেন্সে প্রথমবার পপুলার হাসপাতালের ওই চিকিৎসকের কাছে যান তিনি। পরবর্তীতে চিকিৎসার প্রয়োজনে আরও কয়েকবার প্রায় বাবার বয়সী চিকিৎসকের কাছে যান তিনি।

ওই তরুণীর দায়ের করা অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, কিছু দিন আগে থেকে ওই তরুণী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। গতকাল শনিবার দুপুরে ওই তরুণী ডা. শওকতকে জানান তার ত্বকের সমস্যা আবার বেড়েছে, রাতে তিনি চেম্বারে বসবেন কি না? এ সময় ওই চিকিৎসক চেম্বারেই আছেন জানিয়ে মেয়েটিকে তখনই যেতে বলেন। পরে চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে ওই তরুণী জানতে চান তার সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আছে কি না। এ সময় সেই ডা. শওকত বলেন, যদি সে চায় তবে একটা ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে। তবে ইনজেকশনটি কোমরে দিতে হবে।

তখন ওই তরুণী একটু বিব্রতবোধ করেন। এরপর ওই ডাক্তার বলেন, ‘কাপড়ের ওপর দিয়েই ইনজেকশন দেওয়া যাবে।’

মেয়েটি তার অভিযোগে আরও জানায়, ইনজেকশন দিতে রাজি হয়ে রোগী দেখার টেবিলে শুয়ে পড়লে ওই চিকিৎসক মেয়েটির বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতে থাকেন। মেয়েটি প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, ‘কোথায় ইনজেকশন দিলে ভালো হয় তা চেক করে দেখছেন।’

ওই তরুণী অভিযোগ বলেছেন, চিকিৎসক ইনজেকশন দেওয়ার পর তুলা দিয়ে চেপে না ধরে না তার জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেন। এ অবস্থায় মেয়েটি তাড়াতাড়ি সরে এসে ডাক্তারের ফিস দিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এ সময় সেই ডাক্তার আরেকবার তার গালের ইনফেকশনটি দেখতে চান। গাল দেখার ছলে ডা. শওকত ওই তরুণীকে চুম্বন করেন।

ওই তরুণী ডাক্তারের কাছে ফোন করে চুমু দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডা. শওকত বলেন, ‘ওটা কিছু না, ইনফেকশন আছে কি না দেখছিলাম।’

পরে তরুণী বলেন, ‘এমন তো আমি কখনো দেখিনি, ইনফেকশন আছে কি না সেটা কোনো ডাক্তার কি ঠোঁট দিয়ে চেক করে?’ এ সময় ডাক্তার শওকত হায়দার ওই তরুণীকে বলেন, ‘দুঃখিত’।

অভিযুক্ত চিকিৎসক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, মেয়েটা তার বন্ধুর মেয়ের বন্ধু। এরকম হবার কথা নয়। তবে যে যদি আমার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে তার জন্য আমি ক্ষমা চেয়েছি, দুঃখ প্রকাশ করেছি।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মো. শওকত হায়দারের মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার ফোন করা হলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here