মিসরের হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসি ৬৭ বছর বয়সে গত ১৭ জুন ইন্তেকাল করেছেন। আদালতের এজলাসেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করছে দেশটির সরকার। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, আদালতে বিচার চলাকালে মুরসি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি, আদালতে নয়, কারাগারে শহীদ হয়েছেন তিনি।

মুসলিম ব্রাদারহুডের জনপ্রিয় এই নেতা সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জেনে নিই যা হয়তো অনেকেই জানেন না। মুসলিম ম্যাটার ম্যাগাজিনে তা প্রকাশিত হয়।

১. কোরআনে হাফেজ

মুরসি ছিলেন একজন কোরআনে হাফেজ। ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন পুরোপুরি মুখস্থ ছিল তার। অল্প বয়সেই তিনি কোরআন মুখস্থ করেন। তার এই গুণের কথা অনেকেই জানেন না।

কারাবন্দি অবস্থা তিনি একবার বলেছিলেন, আমি কারাগারে ওদের কাছে কোরআনের একটি কপি চেয়েছিলাম। ওরা আমাকে দেয়নি। কিন্তু, ওরা জানে না আমিতো ৪০ বছর আগেই কোরআন মুখস্থ করেছিলাম। আমিতো শুধু কোরআনের স্পর্শ নিতে চেয়েছিলাম।

২. পিএইচডি শিক্ষক

মুরসি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। প্রকৌশলী বিদ্যায় তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জাগাজিগ ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন।

৩. ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকতেন

আড়ম্বরহীনভাবে একটি মাত্র অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতেন তিনি। অথচ মিসরের প্রেসিডেন্টের জন্য কায়রোতে একাধিক বিলাসবহুল বাসভবন ছিল। প্রাচুর্যপূর্ণ সেই সব বাসভবনে না থেকে তিনি একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছিলেন মুরসি।

৪. সবচেয়ে কম বেতনের প্রেসিডেন্ট

বিশ্বের সবচেয়ে কম বেতনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মুরসি। দেশের ধনকুবের ব্যক্তি ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সুবিধা নিতেন না তিনি, অন্য অনেক রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে যা করে থাকেন। পুরো বছরে তার মোট বেতন ছিল মাত্র ১০ হাজার ডলার। নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া পরিশোধ করতেন বেতন থেকেই।

৫. বোনের চিকিৎসায় সরকারি সুবিধা নেননি

পারিবারিক প্রয়োজনে সরকারি বিশেষ সুবিধা নিতেন না মিসরের এই জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। অসুস্থ বোনকে দেখতে তিনি হাসপাতালে যান। তখন চিকিৎসকরা তাকে জানান, তিনি যদি চান তাহলে ইউরোপ-আমেরিকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তার বোনকে পাঠাতে পারবেন। তার নির্দেশে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সহজেই তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। তাতে রাজি হননি মুরসি। মিসরের অন্যান্য নাগরিকের মতো তার বোন সরকারি হাসপাতালেই মারা গিয়েছিলেন।

৬. বক্তব্যের চেয়ে আজান বড়

অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের এই নেতা। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন কোথাও বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও নামাজের ব্যাপারে সচেতন থাকতেন। আজান না শুনলে বক্তব্য থামিয়ে তিনি জোরে জোরে আজান দিতেন। মানুষের মধ্যে মুরসির এই গুণ দারুণভাবে প্রভাব ফেলতো।

৭. মসজিদে গিয়ে ফজর আদায়

সহজে ফজরের নামাজের জামায়াত বাদ যেতো না তার। দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন জামায়াতে। অধিকাংশ সময় মসজিদে গিয়েই নামাজ আদায় করতেন তিনি। জুমার খুতবাতে অনেক সময় কাঁদতে দেখা যেত তাকে।

৮. অফিসে নিজের ছবি না ঝোলানোর নির্দেশ

অন্যান্য আরব শাসকদের মতো ছবি তুলে ও একাধিক জায়গা সেসব প্রদর্শনের প্রতি তার অনীহা ছিল। মিসরের ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ছবি দেখা যেত সব জায়গায়। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসে মুরসি নির্দেশ দেন, কোনো সরকারি অফিসে তার ছবি ঝোলানো যাবে না। এ ছাড়া হোসনি মোবারকের ছবি নামিয়ে সেখানে আল্লাহর নাম ঝোলানোর নির্দেশ দেন।

৯. মানবিক সহায়তায় আন্তরিক

সেবামূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতেন তিনি। ২০০৪ সালে সুনামি আক্রান্ত ইন্দোনেশিয়াতে ছুটে গিয়েছিলেন মুরসি। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে সেখানে কয়েক হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এইড মিশনের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলেন তিনিও। সেবামূলক কাজে অংশ নিতে তিনি এবং তার পরিবারের জন্য কোনো সুবিধা গ্রহণ করতেন না।

১০. জনদরদি মানুষ

অত্যন্ত জনদরদি ছিলেন মুরসি। একদিন এক নারীকে তিনি রাস্তার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন। তাৎক্ষণিক গাড়ি থামিয়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, ওই নারী একজন বিধবা। তার কোনো আশ্রয় নেই। তখন তিনি তার থাকার জন্য সরকারিভাবে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই নারী আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here