আজকাল প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন৷ আর মোবাইল ফোন মানেই ইন্টারনেট তো থাকবেই থাকবে ৷ এমনকী, বাড়ির বাচ্চারাও ইদানিং মোবাইল ফোনের নেশা জর্জড়িত ৷ কখনও কার্টুন, তো কখনও গান শোনা বা মোবাইল গেম ৷ সবই এখন নখদর্পণে বাচ্চাদের ৷ এক সমীক্ষা বলছে, ১১ থেকে ১৪ বছরের বাচ্চাদের মধ্যেই মোবাইল ফোনের প্রবণতা বেশিমাত্রায় দেখা যায় ৷ কিন্তু আমরা বড়রা কি কখনও লক্ষ্য করে দেখেছি যে, ঠিক কী ভিডিও বা কোন সাইট বাচ্চারা দেখছে ?

অনেক সময়ই দেখা যায়, বাচ্চারা হাতে মোবাইল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ মোবাইল হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হলে, বাজে ব্যবহারও শুরু করছে বড়দের সঙ্গে৷ আর তা নিয়ে অশান্তি শুরু হয় নানা পরিবারে ৷

সমীক্ষা বলছে, এইধরণের পরিস্থিতি বেশিরভাগ পরিবারেই দেখা যায় ৷ আর এই কারণে, অনেক সময় বাচ্চাদের মধ্যে মানসিক বিকার শুরু হয় ৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জায়গা থেকেই শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে ৷ কারণ, সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অনেক সময়ই বাচ্চারা মোবাইল বা ল্যাপটপে নানাবিধ জিনিস দেখতে দেখতে পর্নসাইটে ঢুকে পড়েন এবং এই ঘটনা থেকে বিপত্তিরও মুখে পড়েন ছোট ছোট বাচ্চারা ৷ তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় বকাঝকা না করে বরং শান্তভাবে বোঝানো উচিত ৷

বিশেষজ্ঞদের কথায়, বকাঝকা না করে কোনও লাভ হয় না ৷ বরং এতে আরও গণ্ডগোল পাকাতে পারে ৷ তার চেয়ে বরং খোলাখুলি কথা বলুন ৷ পর্নসাইট দেখার অভ্যাস যে মোটেই ভালো নয়, তা স্পষ্টই জানান ৷

পর্নসাইটের ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরুন আপনার সন্তানের কাছে ৷ বরং ইন্টারনেটের ভালো দিকগুলো তুলে ধরুন তার কাছে ৷

অধিকাংশ বাবামা-ই যে ভুলটা করে বসেন সেটা হল সন্তানকে পর্ন দেখা অবস্থায় হাতে নাতে ধরে ফেললে বা কোনভাবে বুঝতে পারলে যে তাদের সন্তান পর্ন দেখছে, রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ ভুল কখনোই করবেননা। আপনার সন্তানকে আপনার সাথে মন খুলে কথা বলার সুযোগ দিন। আপনি রেগে গেলে সে পরবর্তীতে হয়তো আপনার চোখের আড়ালে অনেক কিছু করে বেড়াবে যা আপনি কোনদিন জানবেনও না।

“শেষমেশ আমার ছেলের এ পরিণতি”, “এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে”, “নিজের মুখ দেখাবা না আমার সামনে’’- এসব দয়া করে বলবেন না। একটু ধৈর্য ধরুন। বিশ্বাস করুন, দোষী প্রমাণিত হবার পর আপনার বাচ্চার মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করবে। এ লজ্জাবোধ তার জন্য যথেষ্ট। তাকে বাড়তি লজ্জা দেবেন না অহেতুক ধমকে দিয়ে। মনে রাখবেন যৌনতা সংক্রান্ত কৌতূহল অস্বাভাবিক না। যৌন চাহিদা ও যৌনতা নিয়ে জানার আগ্রহ আমাদের সবার মাঝেই আছে। এটি আমাদের সহজাত ফিতরাত। আপনি নিজে থেকে আপনার সন্তানের সাথে এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেননি বা আপনার সাথে ওর কমিউনিকেশান গ্যাপ থেকে গেছে, পাশাপাশি চারপাশের যৌনতা তাড়িত পরিবেশের কারণে সে ভুল জায়গায় জ্ঞান আহরণ করতে গেছে।

আপনার সন্তান পর্নোগ্রাফির ফাঁদে পা দেওয়া এক নিরীহ শিকার মাত্র। আপনার সন্তান হয়তো তার বন্ধুদের বা অন্যকারো প্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে তাদের মোবাইলে বা ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফি দেখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। পর্নোগ্রাফির বাজার যেভাবে ইন্টারনেট ছেয়ে গেছে তাতে এর বিধ্বংসী ও বিষাক্ত প্রকোপ থেকে বাঁচা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া যে ওয়েবসাইটগুলোতে অশালীন কিছু নেই সেগুলোতে যে সব বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় তাও অনেক সময় পর্নোগ্রাফির দিকে টেনে নিয়ে যায়।

তাই আবারও বলছি, দয়া করে রাগ করবেন না। প্রথমে আপনার হয়তো ছেলে বা মেয়ের জন্য আফসোস হতে পারে। কিন্তু তারপরও যথেষ্ট সহানুভূতি নিয়ে সন্তানের সাথে কথা বলুন।তাকে বোঝান,“দেখো বাবা, আমার খারাপ লাগছে যে তুমি ওগুলো দেখেছো। বিশ্বাস করো আমি তোমার উপর রাগ করি নি। আমার রাগ তাদের উপর যারা এসব এভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে তোমাদের মাঝে।”

আপনার সন্তানকে ভালমতো বোঝান যে যৌনতা নোংরা কিছু না। বাচ্চাদের যৌনতা সংক্রান্ত বাস্তবতা জানাতেই হবে। আর সেটা আপনার চেয়ে কে ওদের ভালোমতো জানাতে পারবে? লজ্জা করবেননা একদম! বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের মধ্যে যৌনতা নিয়ে কৌতূহল জাগবে। আপনি যদি আপনার সন্তানের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে তাদের বয়সের সাথে যায় এমন পরিমিত আলোচনা না করেন তাহলে সে তার কৌতূহল মেটানোর জন্য অন্য কারো কাছে যাবে। সেটা হতে পারে বন্ধু, কাযিন, ইন্টারনেট। আর এখান থেকেই পর্ন আসক্তির সূচনা হতে পারে। সেই সাথে যৌন নিপীড়িত হবার সম্ভাবনাও।

আপনার বাচ্চার যৌন শিক্ষার জন্য কখনোই স্কুলের ওপর নির্ভর করে বসে থাকবেননা। সেই সাথে স্কুল থেকে আপনার বাচ্চাকে সেক্স এডুকেশান কোর্সে কি শেখানো হচ্ছে সেই দিকে কড়া নজর রাখুন, মাঝেমাঝে তার বই ঘেঁটে দেখুন।

আপনার সন্তানকে পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা বোঝানো। এটা খুব, খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওর যদি পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তাহলে আজ হোক বা কাল হোক সে পর্ন ভিডিও দেখা শুরু করবেই করবে।

আপনার সন্তানের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করুন। আপনার আলোচনাতে কী কী বিষয় উঠে আসবে বা আপনার উপস্থাপনা কেমন হবে সেটা নির্ভর করবে আপনার সন্তানের বয়সের ওপর। নিজে আপনার বাচ্চার সঙ্গে কথা বলতে লজ্জাবোধ করা উচিত না। নিরুপায় হলে আপনার বাচ্চাকে পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতার ওপরে বই পড়াতে পারেন, ভিডিও দেখাতে পারেন। তবে নিশ্চিত করতে হবে যে সে পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতার ওপর স্বচ্ছ একটা ধারণা পাচ্ছে।

আপনার সন্তানকে পর্ন আসক্তি কাটানোর জন্য মোটিভেট করা শুরু করুন। আপনার সন্তানকে পারতপক্ষে একা থাকতে দেবেন না, বিশেষ করে অলস সময়ে। কারণ অলস সময়ই পর্নগ্রাফিতে আসক্ত হবার অন্যতম কারন।

তাকে নানা ধরনের খেলাধুলা বা প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যস্ত রাখুন। ভিডিও গেইমস থেকে যতোটা পারুন দূরে রাখুন। অনলাইন ভিডিও গেইমসের পপ আপ অনেক সময়ই পর্ন সাইটের সন্ধান দিয়ে দেয়। তাকে নিয়ে ঘুরুন বা পারলে প্রতি সপ্তাহে একাবার ফ্যামিলি ট্রিপে বের হন। ওকে সময় দিন।

সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এগুলো খেয়াল করুন। বন্ধুবান্ধব বা অন্য কেউ ওকে পর্র্ন দেখার জন্য জোরাজোরি করলে কীভাবে টেকনিক্যালি “না” বলতে হবে শেখান। কাযিনদের সাথে ও কী নিয়ে গল্প গুজব করে সেগুলো কথায় কথায় জানুন।

বাসায় যে পিসি বা ল্যাপটপ আপনি আপনার সন্তানকে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন তা ড্রয়িং রুম বা এমন কোন রুমে সরিয়ে নিন যেখানে আসতে যেতে সকলের চোখ একবার হলেও পড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here